সকাল আটটা বেজে সাত মিনিটে খবরটা বেরোল—
“মুরাকামির নোবেল চুরি।”
সকাল আটটা দশ মিনিটে খবরটি হোয়াটসঅ্যাপে পৌঁছে গেল।
আটটা বারো মিনিটে একজন লিখল—
“দুঃখজনক। পৃথিবী আর সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য কালো দিন।”
আটটা চৌদ্দ মিনিটে আরেকজন লিখল—
“সভ্যতার পতন।”
আটটা সতেরো মিনিটে কেউ একজন প্রশ্ন করল—
“মুরাকামি কোন দেশের?”
তাকে সঙ্গে সঙ্গে আড়াইশো জন গাল দিল।
কেউ বলল জাপান।
কেউ বলল চীন।
একজন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল—
“নোবেল যেহেতু ইউরোপ দেয়, মানুষটা নিশ্চয়ই ইউরোপীয়।”
সাড়ে আটটার মধ্যে একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম শিরোনাম করল—
“এক্সক্লুসিভ: মুরাকামির নোবেল চুরি, তদন্তে আন্তর্জাতিক চক্র!”
নিচে ছোট অক্ষরে লেখা ছিল—
“মুরাকামি আদৌ নোবেল পেয়েছিলেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।”
কিন্তু ছোট অক্ষর কে পড়ে?
---
রণদীপ তখন দাঁত মাজছিল।
তার ফোন বেজে উঠল।
বন্ধু পল্টু।
—“শুনেছিস?”
—“না।”
—“মুরাকামির নোবেল চুরি।”
রণদীপ থেমে গেল।
—“কোন নোবেল?”
—“নোবেলটাই।”
—“মুরাকামি নোবেল পেয়েছিলেন?”
পল্টু চুপ।
তারপর বলল—
—“এই মুহূর্তে এসব খুঁটিনাটি নিয়ে মাথা ঘামাস না।”
রণদীপ বলল,
—“এটা খুঁটিনাটি?”
—“দেখ, নোবেল পেয়েছিলেন কি না সেটা ইতিহাসের ব্যাপার। কিন্তু চুরি হয়েছে কি না সেটা বর্তমান।”
রণদীপ বুঝল, বন্ধুটি সাংবাদিক হওয়ার পথে রয়েছে।
---
সাড়ে ন’টায় টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান শুরু হলো।
স্টুডিওতে চারজন বিশেষজ্ঞ।
প্রথমজন সাহিত্য সমালোচক।
দ্বিতীয়জন অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দা।
তৃতীয়জন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ।
চতুর্থজন এমন একজন, যিনি টিভিতে নিয়মিত আসেন কিন্তু কেন আসেন তা কেউ জানে না।
অ্যাঙ্কর বললেন—
“প্রথমেই আপনাদের কাছে জানতে চাই, মুরাকামির নোবেল চুরি হওয়ার পেছনে কারা থাকতে পারে?”
সাহিত্য সমালোচক বললেন,
“দেখুন, এটাকে শুধু চুরি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে বিশ্বসাহিত্যের ওপর আক্রমণ।”
গোয়েন্দা বললেন,
“আমার সন্দেহ ভিতরের লোক।”
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ বললেন,
“এখানে ভূ-রাজনীতি আছে।”
চতুর্থজন বললেন,
“আমি ছোটবেলা থেকেই বলছি, মুরাকামি বিপজ্জনক।”
অ্যাঙ্কর উত্তেজিত।
—“কীভাবে?”
—“উনি এমন বই লেখেন যেখানে মানুষ রান্না করে, গান শোনে, বিড়াল থাকে, আর তবু লোকজন মনে করে গভীর কিছু ঘটছে। এটা অত্যন্ত সন্দেহজনক।”
অ্যাঙ্কর গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লেন।
স্ক্রিনের নিচে তখন লেখা—
BREAKING NEWS: মুরাকামির নোবেল চুরি।
তার নিচে আরেক লাইন—
BREAKING NEWS: নোবেল পাওয়ার তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
আর তার নিচে বিজ্ঞাপন—
“আপনার সন্তান কি বই পড়ে? আজই কিনুন আমাদের ইংরেজি শেখার কোর্স!”
---
রণদীপ ঠিক করল, ব্যাপারটা নিজেই খুঁজে দেখবে।
কারণ সে লাইব্রেরিয়ান।
লাইব্রেরিয়ানদের একটা অসুখ আছে।
তারা তথ্যকে সম্মান করে।
এই যুগে এটি সামাজিকভাবে খুবই বিপজ্জনক অভ্যাস।
সে নোবেল পুরস্কারের অফিসিয়াল তালিকা খুলল।
তারপর দেখল।
তারপর আবার দেখল।
তারপর চশমা খুলে মুছল।
তারপর আবার দেখল।
মুরাকামির নাম নেই।
একেবারেই নেই।
রণদীপ পল্টুকে ফোন করল।
—“শোন, মুরাকামি নোবেল পাননি।”
—“কে বলেছে?”
—“নোবেলের অফিসিয়াল তালিকা।”
—“ওটা কি ভেরিফায়েড?”
—“নোবেল পুরস্কারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট।”
—“মানে তুই বলতে চাইছিস, একটা ওয়েবসাইট আমাদের খবরের চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য?”
রণদীপ বলল,
—“হ্যাঁ।”
পল্টু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
—“তুই খুব নেগেটিভ হয়ে গেছিস।”
---
দুপুর নাগাদ পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জরুরি সভা ডাকা হলো।
বিষয়:
“মুরাকামির নোবেল চুরি: উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রতিক্রিয়া।”
প্রথম বক্তা বললেন,
“এই ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে চলবে না।”
দ্বিতীয় বক্তা বললেন,
“এটি পুঁজিবাদী সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ফল।”
তৃতীয় বক্তা বললেন,
“আমাদের মনে রাখতে হবে, পুরস্কার নিজেই একটি ক্ষমতার কাঠামো।”
পেছন থেকে একজন ছাত্র জিজ্ঞেস করল,
“স্যার, কিন্তু উনি তো নোবেল পানইনি।”
পুরো হল নীরব।
সভাপতি মাইক হাতে নিয়ে বললেন,
“এই ধরনের সরলীকরণ একাডেমিক আলোচনার পক্ষে ক্ষতিকর।”
ছাত্রটি বসে পড়ল।
কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে কথা বলা যায়।
কিন্তু ভুল তথ্যকে প্রশ্ন করা যায় না।
---
সন্ধ্যায় রণদীপের কাছে একটি খাম এল।
ভেতরে একটি ছবি।
ছবিতে একটি মেডেল।
নিচে লেখা—
“চুরি যাওয়ার আগে শেষবার দেখা গিয়েছিল।”
রণদীপ ছবিটা বড় করে দেখল।
মেডেলটা আসলে এমনভাবে বানানো যে দূর থেকে নোবেলের মতো লাগে।
কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, তাতে লেখা—
NOBELISH PRIZE
রণদীপ মাথায় হাত দিল।
পেছন থেকে মিশু এসে টেবিলে উঠল।
—“তুই কিছু বুঝলি?”
মিশু ছবির ওপর বসে পড়ল।
রণদীপ বলল,
—“ঠিক আছে। তুই তদন্তে আছিস।”
---
পরদিন সকালে নতুন খবর।
“মুরাকামির নোবেল চুরির সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশের একটি সাহিত্যগোষ্ঠী!”
দুপুরে সংশোধন।
“সাহিত্যগোষ্ঠী নয়, সম্ভবত একটি জাপানি সাহিত্যগোষ্ঠী।”
বিকেলে আবার সংশোধন।
“জাপানি নয়, আন্তর্জাতিক সাহিত্যগোষ্ঠী।”
রাতে—
“চুরির পেছনে কোনো সাহিত্যগোষ্ঠীর হাত নেই।”
এরপর একটি টক শোতে সেই একই বিশেষজ্ঞ বললেন—
“আমি প্রথম দিন থেকেই বলেছিলাম, সাহিত্যগোষ্ঠীর হাত নেই।”
রণদীপ টিভির দিকে তাকিয়ে বলল,
“লোকটার স্মৃতি অসাধারণ।”
মিশু লেজ নাড়ল।
রণদীপ বলল,
“না, এটা বিড়ালদের মতো স্মৃতি নয়। এটা রাজনীতিবিদদের স্মৃতি।”
---
তৃতীয় দিনে রণদীপ সেই রহস্যময় লোকটির সন্ধান পেল।
লোকটির নাম কৌশিক।
সে একটি ছোট ঘরে বসে চা খাচ্ছিল।
রণদীপ বলল,
—“আপনি মুরাকামির নোবেল চুরি করেছেন?”
কৌশিক বলল,
—“না।”
—“তাহলে কে করেছে?”
—“কেউ না।”
—“কিন্তু খবর?”
—“আমিই ছড়িয়েছি।”
রণদীপ তাকিয়ে রইল।
—“কেন?”
কৌশিক বলল,
“একটা পরীক্ষা।”
—“কী পরীক্ষা?”
—“মানুষ কোনো খবর বিশ্বাস করার আগে তথ্য যাচাই করে কি না।”
রণদীপ বলল,
“ফলাফল?”
কৌশিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“মানবসভ্যতা অকৃতকার্য।”
—“কত শতাংশ?”
—“শতভাগ।”
—“কেউ যাচাই করেনি?”
—“একজন করেছে।”
—“কে?”
—“আপনি।”
রণদীপ একটু গর্বিত হলো।
তারপর কৌশিক বলল,
“আর আপনার পোস্টে কেউ লাইক দেয়নি।”
রণদীপের গর্ব সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল।
---
কৌশিক জানাল,
সবকিছু সাজানো ছিল।
একটি নকল মেডেল।
একটি নকল বাক্স।
একটি নকল ছবি।
দুটি ভুয়া সূত্র।
আর তিনজন সাংবাদিককে পাঠানো একটি ই-মেইল।
এইটুকুই যথেষ্ট ছিল।
কেউ নোবেল পুরস্কারের তালিকা দেখেনি।
কেউ মুরাকামির জীবনী পড়েনি।
কেউ জিজ্ঞেস করেনি—
“মুরাকামি নোবেল পেয়েছিলেন কবে?”
সবাই শুধু জিজ্ঞেস করেছে—
“চোর কে?”
রণদীপ বলল,
“মানে মানুষ সত্যের চেয়ে রহস্য বেশি পছন্দ করে?”
কৌশিক বলল,
“না। মানুষ সত্যের চেয়ে এমন একটা গল্প পছন্দ করে যেখানে সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে পারে।”
রণদীপ চুপ করে গেল।
মিশু জানালার ধারে বসে ছিল।
সে সম্ভবত এই কথাটা বহু বছর আগেই বুঝেছিল।
কিন্তু বিড়ালরা সাধারণত জ্ঞানী কথা বলে না।
তারা শুধু এমনভাবে তাকায় যাতে মনে হয়, তুমি যথেষ্ট বোকা।
---
সেই রাতেই রণদীপ একটি শেষ পোস্ট লিখল।
“মুরাকামির নোবেল কখনো চুরি হয়নি। কারণ মুরাকামি নোবেল পাননি।”
পোস্টটি ভাইরাল হলো না।
দুটি লাইক।
একটি মিশুর।
আরেকটি পল্টুর।
পল্টু কমেন্ট করল—
“ভাই, তুই বিষয়টা খুব সিরিয়াসলি নিচ্ছিস।”
রণদীপ উত্তর দিল না।
সে জানালা বন্ধ করল।
মিশুকে বলল,
“চল, ঘুমাই।”
ঠিক তখনই ফোনে নোটিফিকেশন।
নতুন ব্রেকিং নিউজ।
রণদীপ খুলে দেখল।
“মুরাকামির নোবেল চুরি হয়নি—চাঞ্চল্যকর নতুন তথ্য।”
রণদীপ চিৎকার করে উঠল—
“নতুন তথ্য কী?! তিন দিন ধরে আমি এটাই বলছি!”
নিচে প্রতিবেদকের নাম।
পল্টু।
রণদীপ ফোন করল।
—“তুই?”
পল্টু বলল,
—“হ্যাঁ।”
—“তুই এটা লিখলি?”
—“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
—“ক্লিক আসে।”
রণদীপ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—“কিন্তু তুই তো জানিস, এটা সত্যি।”
—“সেই জন্যই তো লিখেছি।”
—“কী?”
পল্টু বলল,
“সত্যি খবর কম মানুষ পড়ে। কিন্তু ‘চাঞ্চল্যকর নতুন তথ্য’ লিখলে সবাই পড়ে।”
রণদীপ ফোন কেটে দিল।
মিশু তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
রণদীপ বলল,
“তুই ঠিকই বলেছিলি।”
মিশু চোখ বন্ধ করল।
তার মুখ দেখে মনে হলো—
মানুষকে নিয়ে সে বহু আগেই আশা ছেড়ে দিয়েছে।
আর সেদিন রাতেই পৃথিবী শান্ত হলো।
মুরাকামির নোবেল ফিরে এল না।
কারণ সেটি কখনো হারায়নি।
চোর ধরা পড়ল না।
কারণ কোনো চোর ছিল না।
শুধু একটি জিনিস এখনও নিখোঁজ রইল—
মানুষের খবর যাচাই করার অভ্যাস।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সেটির কোনো সন্ধান মেলেনি।
তবে একটি সূত্র পাওয়া গেছে।
শেষবার সেটিকে দেখা গিয়েছিল একটি মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে।
সেখানে লেখা ছিল—
“Forwarded as received.”
No comments:
Post a Comment